নিরীশ্বরবাদ, খ্রিষ্টধর্ম এবং আমার তিনটি ঘটনার অভিজ্ঞতা : বারট্রান্ড রাসেল

      

নিরীশ্বরবাদ, খ্রিষ্টধর্ম এবং বারট্রান্ড রাসেলের তিনটি ঘটনার অভিজ্ঞতা 

বারট্রান্ড রাসেল


     আমার জীবনের তিনটি ঘটনা প্রমাণ করবে যে আধুনিক ইংল্যাণ্ডে খ্রিষ্টান ধর্মের স্বপক্ষেই সকল কিছু করা হয়। প্রকাশ্যে নিরীশ্বরবাদে বিশ্বাস করবার যে কি বিপদ অনেক মানুষ এখনো জানে না বলেই আমার ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনার কথা উল্লেখ করলাম।

Bertrand Russell
British philosopher

      প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল আমার জীবনের খুবই শৈশবকালে। আমার বাবা ছিলেন স্বাধীন চিন্তাবিদ। আমার তিন বছর বয়সের সময় তিনি মারা যান। তার ইচ্ছে ছিলনা যে আমি কোনরকমের কুসংস্কারের মধ্যে বেড়ে উঠি; এজন্য দু’জন স্বাধীন চিন্তাবিদকে তিনি আমার অভিভাবক নিযুক্ত করেছিলেন। আদালত তার উইলকে অগ্রাহ্য করে আমাকে খ্রিষ্টধর্মে শিক্ষা দিলো। আমি ভয় পেয়েছিলাম কিন্তু এর কোন প্রভাব আমার ওপর পড়েনি; তা বলে সে দোষ আইনের নয়। যদি তিনি আমাকে খ্রিস্টমতে লফিয়ান, মিউগলটোনিয়ান অথবা সেভেনথডে এডভেটিষ্ট হিসেবে শিক্ষিত করার কথা বলে যেতেন তাহলে আদালত স্বপ্নেও আপত্তি করার কথা ভাবতোনা। একজন বাবার মৃত্যুর পরে তার ছেলেকে কল্পিত কুসংস্কারে দীক্ষিত করার জন্যে বলে যাবার অধিকার আছে, কিন্তু তার ছেলে কুসংস্কার মুক্ত হিসেবে বেড়ে উঠবে একথা বলে যাবার অধিকার নেই।

     দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে ১৯১০ সালে। উদারনৈতিক পার্টির থেকে তখন আমার পার্লামেন্টের নির্বাচনে দাঁড়াবার ইচ্ছে ছিল। পার্টি হুইপ বিশেষ একটি নির্বচনী এলাকা থেকে আমার নাম সুপারিশও করেছিলেন। আমি উদারনৈতিক সভায় বক্তৃতা দান করলাম। তারা সকলে আমার সম্বন্ধে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন, সুতরাং আমার অংশ গ্রহণ করার সবকিছু এরকম ঠিকঠাক হয়ে গেল। এর পরে আভ্যন্তরীণ ক্ষুদ্র একটি অভিসন্ধিপরায়ন দল আমার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, আমি নিরীশ্বরবাদী কিনা। জবাবে আম স্বীকার করলাম যে, আমি একজন নিরীশ্বরবাদী। তারা আরো জিজ্ঞেস করলেন যে মাঝে মাঝে গির্জায় যেতে রাজি আছি কিনা। জবাবে আমি রাজি নই বলে জানিয়ে দিলাম। তারপরে তারা আরেকজন সদস্যকে মনোনয়ন দান করলেন, যিনি ঠিকমত পাশ করে গেলেন এবং তখন থেকে পার্লামেন্টের সদস্য। তিনি বর্তমান সরকারে ও (১৯২২) একজন সদস্য।

     এর অল্প কিছুদিন পরেই তৃতীয় ঘটনাটি ঘটল। আমাকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ট্রিনিটি কলেজে লেকচারারের পদ গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো, কিন্তু ফেলো হিসেবে নয়। ফেলো এবং লেকচারারের মধ্যে মাইনের কোন প্রভেদ নেই। প্রভেদ হলো কলেজের পরিচালনা ব্যবস্থায় ফেলোর ভূমিকা আছে, খুব গুরুতর নৈতিকতাহীনতার অপরাধ ছাড়া মেয়াদ ফুরাবার আগে ফেলোকে বরখাস্ত করা যায় না। কেরাণি-গোষ্ঠীর অকেরাণি সুলভ একটি ভোট বাড়ানোর ইচ্ছে না-থাকার জন্যেই আমাকে ফেলোশিপ প্রদান করা হয়নি। এর ফল হলো ১৯১৬ সালে যুদ্ধ সম্বন্ধে আমার মতামতের সঙ্গে তাদের যখন মিল হলো না তখন তারা আমাকে বরখাস্ত করতে সক্ষম হলো। আমাকে যদি লেকচারারশিপের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হতো, তাহলে আমাকে অনাহারে মরতে হতো।

Bertrand Russell
     এমনকি আধুনিক ইংল্যান্ডেও এ তিনটি ঘটনা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্বাধীন চিন্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনরকমের অসুবিধার দৃষ্টান্ত। অন্যান্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্বাধীন চিন্তাবিদেরা ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আরো ভয়াবহ দৃষ্টান্তের কথা বলতে পারবেন। নগদ ফল হলো, যে লোক পয়সাওয়ালা নয়, ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে তার অকপট ভাবে কথা বলার সাহস করা উচিত নয়। শুধু মাত্র ধর্মীয় কারণে যে স্বাধীনতার ঘাটতি ঘটেছে অথবা ধর্ম স্বাধীনতাকে বাধা দিয়েছে এটা সম্পূর্ন সত্য নয়। নিরীশ্বরবাদীতার চাইতেও সাম্যবাদের বিশ্বাস অথবা স্বাধীন ভালোবাসা একজন মানুষকে অধিকতর বিপদের সম্মুখীন করে। বিশ্বাস করার চাইতেও এদের সমর্থনে যুক্তি দেখিয়ে প্রচার করা ঢের বেশী বিপজ্জনক পক্ষান্তরে রাশিয়াতে প্রকৃতভাবে এর সুবিধা অসুবিধাগুলো সম্পূর্ণভাবে আমাদের বিপরীত, সেখানে নাস্তিকতা, সাম্যবাদ এবং স্বাধীন ভালোবাসার কথা প্রচার করলে আরাম আয়েশ এবং সুযোগ সুবিধা ভোগ করা যায়। এর বিরুদ্ধে অন্য কোন রকমের মতামত প্রচার করার কোন সুযোগ সেখানে নেই। এর ফল হলো, রাশিয়াতে একদল গোঁড়া লোক কতেক সন্দিগ্ধ বিশ্বাসকে চূড়ান্ত সত্য বলে বিশ্বাস করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, অন্যদিকে পৃথিবীর বাকি অংশে এর বিপরীত কতেক বিশ্বাসকে অন্য কোন রকমের মতামত প্রচার করার কোন সুযোগ সেখানে নেই।


______


No comments

Theme images by merrymoonmary. Powered by Blogger.